বাংলাদেশের বিশাল নীল জলরাশি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধারই নয়, বরং এটি হাজার হাজার মৎস্যজীবীর জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। আর এই বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে উপকূল থেকে ৮০-৯০ কিলোমিটার গভীরে মাছ ধরতে যান সাতক্ষীরার হাজারো জেলে। ঝড়, জলদস্যু আর বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই চলে তাদের জীবনযুদ্ধ। জেলেদের বড় অংশের জীবন কাটে অনিশ্চয়তা আর অভাবের মধ্যে। সাতক্ষীরার প্রায় ৪৯ হাজার নিবন্ধিত জেলের শ্যামনগর, আশাশুনি ও তালা উপজেলার একটি বড় অংশ সরাসরি গভীর সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। তবে নিবন্ধিত জেলেদের বাইরেও জেলায় প্রায় লক্ষাধিক অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যারা এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে।”
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সামুদ্রিক মৎস্য বিধিমালা ২০২৩ অনুযায়ী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এই সময়ে সমুদ্রগামী নৌযান দিয়ে যেকোনো প্রজাতির মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হলে কর্মহীন হয়ে পড়ে উপকূলের জেলে পাড়াগুলো।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় বর্তমানে মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার জন। এই জেলেদের মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। এর মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার ৩৫৫ জন। আশাশুনি উপজেলায় ৪ হাজার ৫৫৫ জন এবং তালা উপজেলায় ৯৭৯ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের মধ্যে বর্তমানে ১২ হাজার ৮৭৯ জন ভিজিএফ বা খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকাকালীন ৫৮ দিনের জন্য নিবন্ধিত জেলেদের জনপ্রতি মোট ৭৭.৩৩ কেজি করে বিশেষ ভিজিএফ চাল প্রদান করা হচ্ছে।
মৎস্য বিভাগ ও ট্রলার মালিকদের মতে, নিবন্ধিত ছাড়াও শ্যামনগরে আরও ৪০ হাজার, আশাশুনিতে ২০ হাজার এবং তালা ও কালিগঞ্জে আরও কয়েক হাজার অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যারা দীর্ঘ বছর ধরে এই পেশায় থাকলেও তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন।
নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে শ্যামনগর, আশাশুনি ও তালার জেলে পাড়াগুলোতে এখন শুধুই হাহাকার। কর্মহীন জেলেদের অলস সময় কাটছে ঘাটে বাঁধা নৌকার পাহারায়, আর চোখে-মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ।
গভীর সমুদ্রে যাওয়া জেলে আশাশুনির উপজেলার প্রতাপ নগরের শাহজাহান সরদার বলেন, “আমরা প্রতি বছর প্রায় পাঁচ মাসের জন্য দুবলার চরে অবস্থান করি। আমরা মূলত গভীর সমুদ্রের জেলে; উপকূল থেকে প্রায় ৮০-৯০ কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে আমরা মাছ শিকার করি। আমাদের জালে বিভিন্ন প্রজাতির যে মাছই ধরা পড়ে তার সবটুকুই আমরা চরে এনে শুঁটকি করি। কিন্তু মৌসুম শেষে আমাদের ধার করে সংসার চালাতে হয়। দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের জীবন কাটছে ঋণ আর দাদনের ওপর। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বর্তমানে আমাদের বড় আতঙ্কের নাম জলদস্যু।
শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালী গ্রামের জেলে আজগর আলী বলেন, টানা ৫৮ দিন সাগরে যাওয়া বন্ধ থাকলে আমাদের চরম অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়তে হয়। সরকারের দেওয়া চাল কিছুটা স্বস্তি দিলেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু তো চাল দিয়ে হয় না, আনুষঙ্গিক তরিতরকারি কেনার সামর্থ্যও আমাদের নেই। অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে আমাদের একেকটি দিন কাটছে।
সাতক্ষীরার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, “সাতক্ষীরা জেলার বিশাল এক জনগোষ্ঠী মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে আমাদের তালিকাভুক্ত ৪৯ হাজার জেলের মধ্যে একটি বড় অংশ গভীর সমুদ্রে এবং উপকূলীয় নদ-নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। বিশেষ করে সরকারি নির্দেশনায় যখন মাছ ধরা বন্ধ থাকে, তখন আমরা জেলেদের খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল দিয়ে থাকি। তবে আমরা অনুভব করছি যে, শুধু চাল দিয়ে একটি পরিবারের সম্পূর্ণ ভরণপোষণ কঠিন। তাই আমরা ঊর্ধ্বতন মহলে প্রস্তাব পাঠিয়েছি যাতে চালের পাশাপাশি ডাল, তেল বা আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যও এই সহায়তার আওতায় আনা যায়।
খুলনা গেজেট/এনএম

